স্মৃতিময় শৈশব – বাংলার কবিতা

শৈশবের স্মৃতিময় কবিতাগুলো আজও মনে পড়ে, ভালো লাগে আবারও পড়তে আর কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াতে। এখানে কিছু সংগ্রহ করা কবিতা সবার সঙ্গে শেয়ার করলাম।

Dec 27, 2022 - 07:45
Apr 6, 2023 - 14:19
 0  47
স্মৃতিময় শৈশব – বাংলার কবিতা

আবার আসিব ফিরে – জীবনানন্দ দাশ

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শংখচিল শালিখের বেশে,

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়।


হয়তো বা হাঁস হব- কিশোরীর- ঘুঙুর রহিবে লাল পায়

সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে

জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এই সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।

হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমূলের ডালে।

হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে।

রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে

ডিঙ্গা বায়; রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে

দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।


নিমন্ত্রণ – জসীম উদ্দিন

তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,

গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;

মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি

মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,

মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,

তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,

ছোট গাঁওখানি- ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া,

কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া;

ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী

পারের খবর টানাটানি করি;

বিনাসুতি মালা গাথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া;

বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।

তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে, ছোট সে কাজল গাঁয়,

গলাগলি ধরি কলা বন; যেন ঘিরিয়া রয়েছে তায়।

সরু পথ খানি সুতায় বাঁধিয়া

দূর পথিকেরে আনিছে টানিয়া,

বনের হাওয়ায়, গাছের ছায়ায়, ধরিয়া রাখিবে তায়,

বুকখানি তার ভরে দেবে বুঝি, মায়া আর মমতায়!

তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে – নরম ঘাসের পাতে

চম্বন রাখি অধরখানিতে মেজে লয়ো নিরালাতে।

তেলাকুচা – লতা গলায় পরিয়া

মেঠো ফুলে নিও আঁচল ভরিয়া,

হেথায় সেথায় ভাব করো তুমি বুনো পাখিদের সাথে,

তোমার গায়ের রংখানি তুমি দেখিবে তাদের পাতে।

তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে, তোমারে সঙ্গে করি

নদীর ওপারে চলে যাই তবে লইয়া ঘাটের তরী।

মাঠের যত না রাখাল ডাকিয়া

তোর সনে দেই মিতালী করিয়া

ঢেলা কুড়িইয়া গড়ি ইমারত সারা দিনমান ধরি,

সত্যিকারের নগর ভুলিয়া নকল নগর গড়ি।

তুমি যদি যাও – দেখিবে সেখানে মটর লতার সনে,

সীম আর সীম – হাত বাড়াইলে মুঠি ভরে সেই খানে।

তুমি যদি যাও সে – সব কুড়ায়ে

নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে,

খাব আর যত গেঁয়ো – চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে,

হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব দুইজনে।

তুমি যদি যাও – শালুক কুড়ায়ে, খুব – খুব বড় করে,

এমন একটি গাঁথিব মালা যা দেখনি কাহারো করে,

কারেও দেব না, তুমি যদি চাও

আচ্ছা না হয় দিয়ে দেব তাও,

মালাটিরে তুমি রাখিও কিন্তু শক্ত করিয়া ধরে,

ও পাড়ার সব দুষ্ট ছেলেরা নিতে পারে জোর করে;

সন্ধ্যা হইলে ঘরে ফিরে যাব, মা যদি বকিতে চায়,

মতলব কিছু আঁটিব যাহাতে খুশী তারে করা যায়!

লাল আলোয়ানে ঘুঁটে কুড়াইয়া

বেঁধে নিয়ে যাব মাথায় করিয়া

এত ঘুষ পেয়ে যদি বা তাহার মন না উঠিতে চায়,

বলিব – কালিকে মটরের শাক এনে দেব বহু তায়।

খুব ভোর ক’রে উঠিতে হইবে, সূয্যি উঠারও আগে,

কারেও ক’বি না, দেখিস্ পায়ের শব্দে কেহ না জাগে

রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে

ডানকিনে মাছ কিলবিল করে;

কাদার বাঁধন গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে

সব মাছগুলো কুড়ায়ে আনিব কাহারো জানার আগে।

ভর দুপুরেতে এক রাশ কাঁদা আর এক রাশ মাছ,

কাপড়ে জড়ায়ে ফিরিয়া আসিব আপন বাড়ির কাছ।

ওরে মুখ – পোড়া ওরে বাঁদর।

গালি – ভরা মার অমনি আদর,

কতদিন আমি শুনি নারে ভাই আমার মায়ের পাছ;

যাবি তুই ভাই, আমাদের গাঁয়ে যেথা ঘন কালো গাছ।

যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।

ঘন কালো বন – মায়া মমতায় বেঁধেছে বনের বায়।

গাছের ছায়ায় বনের লতায়

মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!

আজি সে – সব সরায়ে সরায়ে খুজিয়া লইব তায়,

যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গায়।

তোরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে ঘন-পল্লব তলে

লুকায়ে থাকিস, খুজে যেন কেহ পায় না কোনই বলে।

মেঠো কোন ফুল কুড়াইতে যেয়ে,

হারাইয়া যাস পথ নাহি পেয়ে;

অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে ঘুমাস সন্ধ্যা হলে,

সারা গাঁও আমি খুজিয়া ফিরিব তোরি নাম বলে বলে।


একটি শিশির বিন্দু – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে

একটি শিশিরবিন্দু।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ হতে সংগ্রহীত)


আমাদের গ্রাম – বন্দে আলী মিয়া

আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,

থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর৷

পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই,

এক সাথে খেলি আর পাঠশালে যাই৷

আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,

আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইয়াছে প্রাণ৷

মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি,

চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি৷

আম গাছ, জাম গাছ, বাঁশ ঝাড় যেন,

মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন৷

সকালে সোনার রবি পুব দিকে ওঠে,

পাখি ডাকে, বায়ু বয়, নানা ফুল ফোটে৷


কাজলা দিদি-– যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই

মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?

পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে,

ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই;

মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?

সেদিন হতে দিদিকে আর কেনই-বা না ডাকো,

দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?

খাবার খেতে আসি যখন দিদি বলে ডাকি, তখন

ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো,

আমি ডাকি, – তুমি কেন চুপটি করে থাকো?

বল মা, দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?

কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল-বিয়ে হবে!

দিদির মতন ফাঁকি দিয়ে আমিও যদি লুকোই গিয়ে-

তুমি তখন একলা ঘরে কেমন করে রবে?

আমিও নাই দিদিও নাই কেমন মজা হবে!

ভুঁইচাঁপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল,

মাড়াস নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল;

ডালিম গাছের ডালের ফাঁকে বুলবুলিটি লুকিয়ে থাকে,

দিস না তারে উড়িয়ে মা গো, ছিঁড়তে গিয়ে ফল;

দিদি এসে শুনবে যখন, বলবে কী মা বল!

বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই

এমন সময়, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?

বেড়ার ধারে, পুকুর পাড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোঁপে-ঝাড়ে;

নেবুর গন্ধে ঘুম আসে না- তাইতো জেগে রই;

রাত হলো যে, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?


মনে পড়া – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু ভোলানাথ হতে সংগ্রহীত)

মাকে আমার পড়ে না মনে।

শুধু কখন খেলতে গিয়ে

হঠাৎ অকারণে

একটা কী সুর গুনগুনিয়ে

কানে আমার বাজে,

মায়ের কথা মিলায় যেন

আমার খেলার মাঝে।

মা বুঝি গান গাইত, আমার

দোলনা ঠেলে ঠেলে;

মা গিয়েছে, যেতে যেতে

গানটি গেছে ফেলে।

মাকে আমার পড়ে না মনে।

শুধু যখন আশ্বিনেতে

ভোরে শিউলিবনে

শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে

ফুলের গন্ধ আসে,

তখন কেন মায়ের কথা

আমার মনে ভাসে?

কবে বুঝি আনত মা সেই

ফুলের সাজি বয়ে,

পুজোর গন্ধ আসে যে তাই

মায়ের গন্ধ হয়ে।

মাকে আমার পড়ে না মনে।

শুধু যখন বসি গিয়ে

শোবার ঘরের কোণে;

জানলা থেকে তাকাই দূরে

নীল আকাশের দিকে

মনে হয়, মা আমার পানে

চাইছে অনিমিখে।

কোলের ‘পরে ধরে কবে

দেখত আমায় চেয়ে,

সেই চাউনি রেখে গেছে

সারা আকাশ ছেয়ে।


হাসি – রোকনুজ্জামান খান

হাসতে নাকি জানেনা কেউ

কে বলেছে ভাই?

এই শোন না কত হাসির

খবর বলে যাই।

খোকন হাসে ফোঁকলা দাঁতে

চাঁদ হাসে তার সাথে সাথে

কাজল বিলে শাপলা হাসে

হাসে সবুজ ঘাস।

খলসে মাছের হাসি দেখে

হাসে পাতিহাঁস।

টিয়ে হাসে, রাঙ্গা ঠোঁটে,

ফিঙ্গের মুখেও হাসি ফোটে

দোয়েল কোয়েল ময়না শ্যামা

হাসতে সবাই চায়।

বোয়াল মাছের দেখলে হাসি

পিলে চমকে যায়।

এত হাসি দেখেও যারা

গোমড়া মুখে চায়,

তাদের দেখে পেঁচার মুখেও

কেবল হাসি পায়।


ইচ্ছা – আহসান হাবিব

মনারে মনা কোথায় যাস?

বিলের ধারে কাটব ঘাস।

ঘাস কি হবে?

বেচব কাল,

চিকন সুতোর কিনব জাল।

জাল কি হবে?

নদীর বাঁকে

মাছ ধরব ঝাঁকে ঝাঁকে।

মাছ কি হবে?

বেচব হাটে,

কিনব শাড়ি পাটে পাটে।

বোনকে দেব পাটের শাড়ি,

মাকে দেব রঙ্গিন হাঁড়ি।


বৃষ্টির ছড়া – ফররুখ আহমদ

বৃষ্টি এল কাশ বনে

জাগল সাড়া ঘাস বনে,

বকের সারি কোথা রে

লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে।

নদীতে নাই খেয়া যে,

ডাকল দূরে দেয়া যে,

কোন সে বনের আড়ালে

ফুটল আবার কেয়া যে।

গাঁয়ের নামটি হাটখোলা,

বিষটি বাদল দেয় দোলা,

রাখাল ছেলে মেঘ দেখে,

যায় দাঁড়িয়ে পথ-ভোলা।

মেঘের আঁধার মন টানে,

যায় সে ছুটে কোন খানে,

আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে

আমন ধানের দেশ পানে।


.. .. ঝুমকো জবা – ফররুখ আহমদ

ঝুমকো জবা বনের দুল

উঠল ফুটে বনের ফুল।

সবুজ পাতা ঘোমটা খোলে

ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে।

সেই দুলনির তালে তালে

মন উড়ে যায় ডালে ডালে।


…… ব্যাঙের বাসা ……

( প্রচলিত )

তাঁতির বাড়ি

ব্যাঙের বাসা

কোলা ব্যাঙের ছা।

খায় দায়

গান গায়

তাইরে নাইরে না।


….. কে মেরেছে কে ধরেছে …..

কে মেরেছে কে ধরেছে

কে দিয়েছে গাল ?

তাইতো খোকন রাগ করেছে

ভাত খায়নি কাল।


…… নোটন নোটন পায়রা গুলি ……

নোটন নোটন পায়রা গুলি

ঝোটন বেধেছে

ওপারেতে ছেলে মেয়ে

নাইতে নেমেছে

দুই ধারে দুই রুই কাতলা

ভেসে উঠেছে

কে দেখেছে কে দেখেছে

দাদা দেখেছে

দাদার হাতে কলম ছিল

ছুড়ে মেরেছে

উঃ বড্ড লেগেছে।


…… আম পাতা জোড়া জোড়া ……

আম পাতা জোড়া জোড়া

মারবো চাবুক চড়বো ঘোড়া

ওরে বুবু সরে দাড়া

আসছে আমার পাগলা ঘোড়া

পাগলা ঘোড়া খেপেছে

চাবুক ছুড়ে মেরেছে।


…… আতা গাছে তোতা পাখি ……

আতা গাছে তোতা পাখি

ডালিম গাছে মৌ,

এতো ডাকি তবু কথা

কও না কেন বউ।


…… বাক বাকুম পায়রা ……

বাক বাকুম পায়রা

মাথায় দিয়ে টায়রা

বউ সাজবে কালকি

চড়বে সোনার পালকি।


….. খোকন খোকন ডাক পাড়ি…..

খোকন খোকন ডাক পাড়ি

খোকন মোদের কার বাড়ি?

আয়রে খোকন ঘরে আয়,

দুধমাখা ভাত কাকে খায়।


কাজের লোক – নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

মৌমাছি, মৌমাছি

কোথা যাও নাচি নাচি

দাঁড়াও না একবার ভাই।

ওই ফুল ফোটে বনে

যাই মধু আহরণে

দাঁড়াবার সময় তো নাই।

ছোট পাখি, ছোট পাখি

কিচিমিচি ডাকি ডাকি

কোথা যাও বলে যাও শুনি।

এখন না কব কথা

আনিয়াছি তৃণলতা

আপনার বাসা আগে বুনি।

পিপীলিকা, পিপীলিকা

দলবল ছাড়ি একা

কোথা যাও, যাও ভাই বলি।

শীতের সঞ্চয় চাই

খাদ্য খুঁজিতেছি তাই

ছয় পায়ে পিলপিল চলি।


ছুটি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বাদল গেছে টুটি,

আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।

কী করি আজ ভেবে না পাই

পথ হারিয়ে কন বনে যাই,

কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই

সকল ছেলে জুটি,

আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।


মামার বাড়ি – জসীমউদ্‌দীন

আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা

ফুল তুলিতে যাই,

ফুলের মালা গলায় দিয়ে

মামার বাড়ি যাই।

ঝড়ের দিনে মামার দেশে

আম কুড়াতে সুখ,

পাকা জামের মধুর রসে

রঙিন করি মুখ।


মজার দেশ – যোগীন্দ্রনাথ সরকার

এক যে আছে মজার দেশ, সব রকমে ভালো,

রাত্তিরেতে বেজায় রোদ, দিনে চাঁদের আলো !

আকাশ সেথা সবুজবরণ গাছের পাতা নীল;

ডাঙ্গায় চরে রুই কাতলা জলের মাঝে চিল !

সেই দেশেতে বেড়াল পালায়, নেংটি-ইঁদুর দেখে;

ছেলেরা খায় ‘ক্যাস্টর-অয়েল’ -রসগোল্লা রেখে !

মণ্ডা-মিঠাই তেতো সেথা, ওষুধ লাগে ভালো;

অন্ধকারটা সাদা দেখায়, সাদা জিনিস কালো !

ছেলেরা সব খেলা ফেলে বই নে বসে পড়ে;

মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়া লোকের পিঠে চড়ে !

ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই, উড়তে থাকে ছেলে;

বড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে, মাছেরা ছিপ্ ফেলে !

জিলিপি সে তেড়ে এসে, কামড় দিতে চায়;

কচুরি আর রসগোল্লা ছেলে ধরে খায় !

পায়ে ছাতি দিয়ে লোকে হাতে হেঁটে চলে !

ডাঙ্গায় ভাসে নৌকা-জাহাজ, গাড়ি ছোটে জলে !

মজার দেশের মজার কথা বলবো কত আর;

চোখ খুললে যায় না দেখা মুদলে পরিষ্কার !


বাবুরাম সাপুড়ে – সুকুমার রায়

বাবুরাম সাপুড়ে,

কোথা যাস্‌ বাপুরে?

আয় বাবা দেখে যা,

দুটো সাপ রেখে যা !

যে সাপের চোখ নেই,

শিং নেই নোখ্‌ নেই,

ছোটে না কি হাঁটে না,

কাউকে যে কাটে না,

করে নাকো ফোঁস ফাঁস,

মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ,

নেই কোন উৎপাত,

খায় শুধু দুধ ভাত-

সেই সাপ জ্যান্ত

গোটা দুই আনত ?

তেড়ে মেরে ডাণ্ডা

ক’রে দেই ঠাণ্ডা ।


পাছে লোকে কিছু বলে – কামিনী রায়

করিতে পারি না কাজ

সদা ভয় সদা লাজ

সংশয়ে সংকল্প সদা টলে –

পাছে লোকে কিছু বলে।

আড়ালে আড়ালে থাকি

নীরবে আপনা ঢাকি,

সম্মুখে চরণ নাহি চলে

পাছে লোকে কিছু বলে।

হৃদয়ে বুদবুদ মত

উঠে চিন্তা শুভ্র কত,

মিশে যায় হৃদয়ের তলে,

পাছে লোকে কিছু বলে।

কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি

সযতনে শুকায়ে রাখি;-

নিরমল নয়নের জলে,

পাছে লোকে কিছু বলে।

একটি স্নেহের কথা

প্রশমিতে পারে ব্যথা –

চলে যাই উপেক্ষার ছলে,

পাছে লোকে কিছু বলে।

মহৎ উদ্দেশ্য যবে,

এক সাথে মিলে সবে,

পারি না মিলিতে সেই দলে,

পাছে লোকে কিছু বলে।

বিধাতা দেছেন প্রাণ

থাকি সদা ম্রিয়মাণ;

শক্তি মরে ভীতির কবলে,

পাছে লোকে কিছু বলে।


তালগাছ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু ভোলানাথ হতে সংগ্রহীত)

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

সব গাছ ছাড়িয়ে

উঁকি মারে আকাশে।

মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়,

একেবারে উড়ে যায়

কোথা পাবে পাখা সে ।

তাই তো সে ঠিক তার মাথাতে

গোল গোল পাতাতে

ইচ্ছাটি মেলে তার

মনে মনে ভাবে বুঝি ডানা এই,

উড়ে যেতে মানা নেই

বাসাখানি ফেলে তার ।

সারাদিন ঝরঝর থত্থর

কাঁপে পাতা পত্তর

ওড়ে যেন ভাবে ও,

মনে মনে আকাশেতে বেড়িয়ে

তারাদের এড়িয়ে

যেন কোথা যাবে ও।

তারপরে হাওয়া যেই নেমে যায়

পাতা কাঁপা থেমে যায়,

ফেরে তার মনটি

যেই ভাবে মা যে হয় মাটি তার,

ভালো লাগে আরবার

পৃথিবীর কোণটি।


বুঝিবে সে কিসে – কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কিছু কবিতা

চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন

ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে।

কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে

কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।

যতদিন ভবে, না হবে না হবে,

তোমার অবস্থা আমার সম।

ঈষৎ হাসিবে, শুনে না শুনিবে

বুঝে না বুঝিবে, যাতনা মম।


অপব্যয়ের ফল

যে জন দিবসে মনের হরষে

জ্বালায় মোমের বাতি,

আশু গৃহে তার দখিবে না আর

নিশীথে প্রদীপ ভাতি।


দুখের তুলনা

একদা ছিল না ‘জুতো’ চরণ-যুগলে

দহিল হৃদয় মম সেই ক্ষোভানলে।

ধীরে ধীরে চুপি চুপি দুঃখাকুল মনে,

গেলাম ভজনালয়ে ভজন কারণে !

দেখি তথা এক জন, পদ নাহি তার,

অমনি ‘জুতো’র খেদ ঘুচিল আমার,

পরের অভাব মনে করিলে চিন্তন

নিজের অভাব ক্ষোভ রহে কতক্ষণ ?


দুই বিঘা জমি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কাহিনী হতে সংগ্রহীত)

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে।

বাবু বলিলেন, “বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।’

কহিলাম আমি, “তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।

চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো-জোর মরিবার মতো ঠাঁই।’

শুনি রাজা কহে, “বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখান

পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা–

ওটা দিতে হবে।’ কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি

সজল চক্ষে, “করুণ বক্ষে গরিবের ভিটেখানি।

সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,

দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!’

আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,

কহিলেন শেষে ক্রূর হাসি হেসে, “আচ্ছা, সে দেখা যাবে।’

পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে–

করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।

এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি–

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।

মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,

তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।

সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য

কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য!

ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি

তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।

হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো-ষোলো–

একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হল।

নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!

গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।

অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,

ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।

পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ,

স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল– নিশীথশীতল স্নেহ।

বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে–

মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।

দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে–

কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে,

রাখি হাটখোলা, নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে

তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।

ধিক্‌ ধিক্‌ ওরে, শতধিক্‌ তোরে, নিলাজ কুলটা ভূমি!

যখনি যাহার তখনি তাহার, এই কি জননী তুমি!

সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা

আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা!

আজ কোন্‌ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ–

পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!

আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন–

তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!

ধনীর আদরে গরব না ধরে ! এতই হয়েছ ভিন্ন

কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন!

কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি!

যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী, হলে দাসী।

বিদীর্ণ হিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি–

প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে, সেই আমগাছ একি!

বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,

একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক-কালের কথা।

সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,

অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।

সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন–

ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!

সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,

দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।

ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা,

স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।

হেনকালে হায় যমদূত-প্রায় কোথা হতে এল মালী,

ঝুঁটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।

কহিলাম তবে, “আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব–

দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব!’

চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ–

বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ।

শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, “মারিয়া করিব খুন!’

বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।

আমি কহিলাম, “শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!’

বাবু কহে হেসে, “বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।’

আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে–

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!


আদর্শ ছেলে – কুসুমকুমারী দাশ

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ?

মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন

“মানুষ হইতে হবে” — এই তার পণ,

বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান,

নাই কি শরীরে তব রক্ত মাংস প্রাণ ?

হাত, পা সবারই আছে মিছে কেন ভয়,

চেতনা রয়েছে যার সে কি পড়ে রয় ?

সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়,

আসে যার চোখে জল মাথা ঘুরে যায় |

সাদা প্রাণে হাসি মুখে কর এই পণ —

“মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন” |

কৃষকের শিশু কিংবা রাজার কুমার

সবারি রয়েছে কাজ এ বিশ্ব মাঝার,

হাতে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান

তোমরা মানুষ হলে দেশের কল্যাণ |


কপোতাক্ষ নদ – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;

সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া- মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।

বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?

দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।

আর কি হে হবে দেখা?- যত দিন যাবে,

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে

বারি-রুপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে

বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখা-রীতে

নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে

লইছে যে নাম তব বঙ্গের সংগীতে।


বিপদে মোরে রক্ষা করো – – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহীত)

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা–

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়॥

সহায় মোর না যদি জুটে নিজের বল না যেন টুটে,

সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা

নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা–

তরিতে পারি শকতি যেন রয়।

আমার ভার লাঘব করি নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

বহিতে পারি এমনি যেন হয়।

নম্রশিরে সুখের দিনে তোমারি মুখ লইব চিনে–

দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা

তোমারে যেন না করি সংশয়।


সোনার তরী – – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সোনার তরী হতে সংগ্রহীত)

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা

খরপরশা।

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,

চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।

পরপারে দেখি আঁকা

তরুছায়ামসীমাখা

গ্রামখানি মেঘে ঢাকা

প্রভাতবেলা–

এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,

দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ভরা-পালে চলে যায়,

কোনো দিকে নাহি চায়,

ঢেউগুলি নিরুপায়

ভাঙে দু-ধারে–

দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,

বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।

যেয়ো যেথা যেতে চাও,

যারে খুশি তারে দাও,

শুধু তুমি নিয়ে যাও

ক্ষণিক হেসে

আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।

যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।

আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।

এতকাল নদীকূলে

যাহা লয়ে ছিনু ভুলে

সকলি দিলাম তুলে

থরে বিথরে–

এখন আমারে লহ করুণা করে।

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।

শ্রাবণগগন ঘিরে

ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

শূন্য নদীর তীরে

রহিনু পড়ি–

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।


পণ্ডশ্রম – শামসুর রাহমান

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে,

কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে।

কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল?

কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।

যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে,

পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে।

সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি,

যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।

মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু,

ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু!

ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে

কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে?

নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে;

কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।

ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম?

বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।


স্বাধীনতা তুমি – শামসুর রাহমান

স্বাধীনতা তুমি

রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।

স্বাধীনতা তুমি

কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো

মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-

স্বাধীনতা তুমি

শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা

স্বাধীনতা তুমি

পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।

স্বাধীনতা তুমি

ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।

স্বাধীনতা তুমি

রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।

স্বাধীনতা তুমি

মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।

স্বাধীনতা তুমি

অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।

স্বাধীনতা তুমি

বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর

শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।

স্বাধীনতা তুমি

চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।

স্বাধীনতা তুমি

কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।

স্বাধীনতা তুমি

শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক

স্বাধীনতা তুমি

পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।

স্বাধীনতা তুমি

উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।

স্বাধীনতা তুমি

বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।

স্বাধীনতা তুমি

বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।

স্বাধীনতা তুমি

গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,

হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।

স্বাধীনতা তুমি

খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,

খুকীর অমন তুলতুলে গালে

রৌদ্রের খেলা।

স্বাধীনতা তুমি

বাগানের ঘর, কোকিলের গান,

বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,

যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।


স্বাধীনতার সুখ – – রজনীকান্ত সেন

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,

“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,

আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে

তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”

বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তাই ?

কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।

পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,

নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”


The Joy of Independence

Says the Sparrow to the Weaver Bird

“Look where I live – a mansion, no less!

While your nest barely shields you from the wind and the rain.

Yet you prize it as art?”

The Weaver Bird smiles, “There is no doubt,

that my nest sways in the slightest wind,

but I live in it gladly,

for unlike the mansion you share with humans

my house is mine and mine alone.

– Rajanikanta Sen


সংকল্প – – কাজী নজরুল ইসলাম

থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, –

কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

দেশ হতে দেশ দেশান্তরে

ছুটছে তারা কেমন করে,

কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,

কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরন-যন্ত্রণারে।।

কেমন করে বীর ডুবুরি সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,

কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বর্গপানে।

জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি

যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি,

কেমন করে আনছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,

কেমন জোরে টানলে সাগর উথলে ওঠে জোয়ার-বানে।

কেমন করে মথলে পাথার লক্ষ্মী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,

কিসের আভিযানে মানুষ চলছে হিমালয়ের চুড়ে।

তুহিন মেরু পার হয়ে যায়

সন্ধানীরা কিসের আশায়;

হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরে;

শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন ‘মঙ্গল’ হতে আসছে উড়ে।।

কোন বেদনায় টিকি কেটে চণ্ডু-খোর এ চীনের জাতি

এমন করে উদয়-বেলায় মরণ-খেলায় ওঠল মাতি।

আয়র্লণ্ড আজ কেমন করে

স্বাধীন হতে চলছে ওরে;

তুরস্ক ভাই কেমন করে কাটল শিকল রাতারাতি!

কেমন করে মাঝ-গগনে নিবল গ্রীসের সূর্য-বাতি।।

রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে-

আকাশ-বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে।

আমার সীমার বাঁধন টুটে

দশ দিকেতে পড়ব লুটে;

পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে;

বিশ্ব- জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।


আমাদের ছোট নদী – – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।

পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,

দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।

চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,

একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।

কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,

রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।

আর-পারে আমবন তালবন চলে,

গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।

তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে

গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।

সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে

আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।

বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,

বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।

আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর

মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।

মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে,

ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে।

দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,

বরষার উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া।।


কুটুম্বিতা-বিচার – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কণিকা হতে সংগৃহিত)

কেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে,

ভাই ব’লে ডাক যদি দেব গলা টিপে।

হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা–

কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা!


কবর – জসীমউদ্দিন

এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,

পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।

এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,

সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা।

সোনালী ঊষায় সোনামুখে তার আমার নয়ন ভরি,

লাঙ্গল লইয়া ক্ষেতে ছুটিতাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।

যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত,

এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোর তামাশা করিত শত।

এমন করিয়া জানিনা কখন জীবনের সাথে মিশে,

ছোট-খাট তার হাসি-ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।

বাপের বাড়িতে যাইবার কালে কহিত ধরিয়া পা,

আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।

শাপলার হাটে তরমুজ বেচি দু পয়সা করি দেড়ী,

পুঁতির মালা এক ছড়া নিতে কখনও হতনা দেরি।

দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,

সন্ধ্যাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুর বাড়ির বাটে !

হেস না–হেস না–শোন দাদু সেই তামাক মাজন পেয়ে,

দাদী যে তোমার কত খুশি হোত দেখিতিস যদি চেয়ে।

নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, ‘এতদিন পরে এলে,

পথপানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখি জলে।’

আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,

কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝ্ঝুম নিরালায়।

হাত জোড় করে দোয়া মাঙ্ দাদু, ‘আয় খোদা, দয়াময়,

আমার দাদীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নাজেল হয়।’

তার পরে এই শুন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি,

যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।

শত কাফনের শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি

গনিয়া গনিয়া ভুল করে গনি সারা দিনরাত জাগি।

এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,

গাড়িয়া দিয়াছি কতসোনা মুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।

মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে লাগায়ে বুক,

আয় আয় দাদু, গলাগলি ধরে কেঁদে যদি হয় সুখ।

এইখানে তোর বাপ্জী ঘুমায়, এইখানে তোর মা,

কাঁদছিস তুই ? কি করিব দাদু, পরান যে মানে না !

সেই ফাল্গুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,

বা-জান, আমার শরীর আজিকে কি যে করে থাকি থাকি।

ঘরের মেঝেতে সপ্ টি বিছায়ে কহিলাম, বাছা শোও,

সেই শোওয়া তার শেষ শোওয়া হবে তাহা কি জানিত কেউ ?

গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,

তুমি যে কহিলা–বা-জানেরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?

তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,

সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে।

তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দু হাতে জড়ায়ে ধরি,

তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিত সারা দিন-মান ভরি।

গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,

ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো মাঠখানি ভরে।

পথ দিয়ে যেতে গেঁয়ো-পথিকেরা মুছিয়া যাইতো চোখ,

চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।

আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,

হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।

গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,

চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।

উদাসিনী সেই পল্লীবালার নয়নের জল বুঝি,

কবর দেশের আন্ধার ঘরে পথ পেয়েছিল খুঁজি।

তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,

হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বীষের তাজ।

মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, ‘বাছারে যাই,

বড় ব্যথা রল দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;

দুলাল আমার, দাদু রে আমার, লক্ষ্মী আমার ওরে,

কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।’

ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গণ্ড ভিজায়ে নয়ন-জলে,

কি জানি আশিস্ করি গেল তোরে মরণ-ব্যথার ছলে।

ক্ষণ পরে মোরে ডাকিয়া কহিল, ‘আমার কবর গায়,

স্বামীর মাথার ‘মাথাল’ খানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।’

সেই সে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,

পরানের ব্যথা মরে না কো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।

জোড়-মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু-ছায়,

গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়ে।

জোনাকি মেয়েরা সারা রাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,

ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নুপুর কত যেন বেসে ভাল।

হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,’রহমান খোদা, আয়,

ভেস্ত নাজেল করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়ে।’

এইখানে তোর বু-জীর কবর, পরীর মতন মেয়ে,

বিয়ে দিয়েছিনু কাজীদের ঘরে বনিয়াদী ঘর পেয়ে।

এত আদরের বু-জীরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে।

হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।

খবরের পর খবর পাঠাত, ‘দাদু যেন কাল এসে,

দু দিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।

শ্বশুর তাহার কসাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে,

অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।

সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে, ফোটে না সেথায় হাসি,

কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিত ভাসি।

বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,

কে জানিত হায়, তাহারও পরানে বাজিবে মরণ-বীণ!

কি জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,

এইখানে তারে কবর দিয়াছি দেখে যাও দাদু ধীরে।

ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেউ ভাল,

কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।

বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,

পাতায় পাতায় কেঁপে ওঠে যেন তারি বেদনার বীণ।

হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,’আয় খোদা দয়াময়!।

আমার বু-জীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নাজেল হয়।’

হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু সাত বছরের মেয়ে,

রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।

ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কি জানি ভাবিত সদা,

অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা।

ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,

তোমার দাদীর মুখখানি মোর হৃদয়ে উঠিত ছেয়ে।

বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,

রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।

একদিন গেনু গজ্নার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,

ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।

সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে,

কি জেনি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গ্যাছে।

আপন হাতেতে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি–

দাদু ধর–ধর–বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।

এইখানে এই কবরের পাশে, আরও কাছে আয় দাদু,

কথা ক’সনাক, জাগিয়া উঠিবে ঘুম-ভোলা মোর যাদু।

আস্তে আস্তে খুড়ে দেখ্ দেখি কঠিন মাটির তলে,

দীন দুনিয়ার ভেস্ত আমার ঘুমায় কিসের ছলে।

ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে,

এমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।

মজীদ হইছে আজান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর,

মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দুর!

জোড়হাতে দাদু মোনাজাত কর্, ‘আয় খোদা, রহমান,

ভেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যু-ব্যথিত প্রাণ!


রানার – সুকান্ত ভট্টাচার্য

রানার ছুটেছে তাই ঝুম্‌ঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে

রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,

রানার চলেছে, রানার !

রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার ।

দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-

কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার ।

রানার ! রানার !

জানা-অজানার

বোঝা আজ তার কাঁধে,

বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;

রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,

আরো জোরে, আরো জোরে হে রানার দু্র্বার দুর্জয় ।

তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে সরে যায় বন,

আরো পথ, আরো পথ – বুঝি লাল হয় ও – পূর্ব কোণ ।

অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিট্‌মিট্ করে চায়;

কেমন ক’রে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায় !

কত গ্রাম, কত পথ যায় স’রে স’রে –

শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;

হাতে লন্ঠন করে ঠন্‌ঠন্, জোনাকিরা দেয় আলো

মাভৈঃ রানার ! এখনো রাতের কালো ।

এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,

পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’ ।

ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে

জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে ।

অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,

ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে ।

রানার ! রানার !

এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে ?

রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে ?

ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,

পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,

রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,

দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে ।

কত চিঠি লেখে লোকে –

কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে ।

এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,

এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,

এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,

এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে ।

দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি, –

এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি –

রানার ! রানার ! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে ?

কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ?

রানার ! রানার ! ভোর তো হয়েছে – আকাশ হয়েছে লাল

আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল ?

রানার ! গ্রামের রানার !

সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;

শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ

ভীরুতা পিছনে ফেলে –

পৌঁছে দাও এ নতুন খবর,

অগ্রগতির ‘মেলে’,

দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি –

নেই, দেরি নেই আর,

ছুটে চলো, ছুটে চলো আরো বেগে

দুর্দম, হে রানার ॥


ভালো থেকো- হুমায়ুন আজাদ

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।

ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।

ভালো থেকো।

ভালো থেকো চর, ছোট কুড়ে ঘর, ভালো থেকো।

ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির।

ভালো থেকো জল, নদীটির তীর।

ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।

ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাশিঁ।

ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি।

ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।

ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল,

ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল,

ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও,ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।

ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।


অধম ও উত্তম – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

কুকুর আসিয়া এমন কামড়

দিল পথিকের পায়

কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে

বিষ লেগে গেল তায়।

ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা

বিষম ব্যথায় জাগে,

মেয়েটি তাহার তারি সাথে হায়

জাগে শিয়রের আগে।

বাপেরে সে বলে ভর্ৎসনা-ছলে

কপালে রাখিয়া হাত,

“তুমি কেন বাবা, ছেড়ে দিলে তারে

তোমার কি নেই দাঁত !”

কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল

“তুই রে হাসালি মোরে,

দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়

দংশি কেমন করে !

কুকুরের কাজ কুকুর করেছে

কামড় দিয়েছে পায়,

তা ব’লে কুকুরে কামড়ানো কি রে

মানুষের শোভা পায় ?”


প্রতিদান – জসীমউদ্দীন

আমার এ ঘর ভাঙ্গিয়াছে যেবা, আমি বাধি তার ঘর,

আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।

যে মোরে করিল পথের বিবাগী;

পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি;

দীঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হয়েছে মোর;

আমার এ ঘর ভাঙ্গিয়াছে যেবা, আমি বাধি তার ঘর ।

আমার একুল ভাঙ্গিয়াছে যেবা আমি তার কুল বাধি,

যে গেছে বুকেতে আঘাত হানিয়া তার লাগি আমি কাঁদি;

সে মোরে দিয়েছে বিষ ভরা বান,

আমি দেই তারে বুক ভরা গান;

কাটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম ভর,

আপন করিতে কাদিঁয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর ।

মোর বুকে যেবা কবর বেধেছে আমি তার বুক ভরি,

রঙ্গীন ফুলের সোহাগ জড়ান ফুল মালঞ্চ ধরি।

যে মুখে সে নিঠুরিয়া বাণী,

আমি লয়ে সখী, তারি মুখ খানি,

কত ঠাই হতে কত কি যে আনি, সাজাই নিরন্তর,

আপন করিতে কাদিয়া বেড়াই যে মোরে করিয়াছে পর ।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0