এক ভাইয়ের হাত
পনের শতাব্দীর কথা। নূরেমবার্গের কাছাকাছি ছোট্ট একটা গ্রামে বাস করত এক পরিবার, যে-পরিবারে সন্তান সংখ্যা ছিল আঠারো জন। আঠারো জন!
টেবিলে কেবল খাবার জুগিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবারের বাবাকে স্বর্ণকারের কাজ করার পাশাপাশি পাড়া প্রতিবেশীর কাছ থেকে পাওয়া ছোটো-খাটো কাজে প্রতিদিন আঠারো ঘন্টা ব্যায় করতে হত। আশাহীন এক পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, পরিবারের বড় দুই সন্তানের একটা স্বপ্ন ছিল। তারা দুজনেই চিত্রশিল্পি হওয়ার জন্য তাদের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু তারা খুব ভালো করেই জানতো, নূরেমবার্গের একাডেমিতে পড়াশোনা করার জন্য দু´জনের একজনকেও তাদের বাবা কখনোই আর্থিকভাব সমর্থন করতে পারবে না।
গাদাগাদি করে থাকা তাদের শোয়ার ঘরে অনেকবার দীর্ঘ আলোচনার পর এই দুই ভাই একদিন এক উপায় খুঁজে পায়। তারা একটা পয়সা দিয়ে গুলিবাট করবে। যে হেরে যাবে, সে নিকটবর্তী খনিতে গিয়ে কাজ করবে আর তার আয় করা টাকা দিয়ে অন্যজন একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেবে। এরপর, যে-ভাই গুলিবাটে জিতবে, সে চার বছর পড়াশোনা শেষ করে যখন ফিরে আসবে, তখন সে অন্য ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য অর্থ জোগাবে, হয় তার আঁকা ছবি বিক্রি করে নতুবা প্রয়োজনে খনিতে গিয়ে কাজ করে। রবিবার চার্চ থেকে বের হয়ে তারা একটা পয়সা দিয়ে গুলিবাট করে। আলব্রেস্ট ডুরার গুলিবাটে জেতেন এবং নূরেমবার্গে যান।
আলবার্ট বিপদজনক খনিতে কাজ করতে শুরু করেন আর পরবর্তী চার বছর তার সেই ভাইকে অর্থের যোগান দিয়ে সাহায্য করেন, যিনি একাডেমিতে অতি উৎসাহের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন। আলব্রেস্টের আঁকা নকশা, কাঠের খোদাই কর্ম ও তার তৈল চিত্র সেখানকার প্রায় সমস্ত শিক্ষকের চেয়েও অনেক উৎকৃষ্ট ছিল। আর তার গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগেই তিনি কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করে বেশ অর্থ উপার্জন করতে শুরু করেন।
সেই অল্পবয়সী চিত্রশিল্পি যখন তার গ্রামে ফিরে আসেন, তখন ডুরার পরিবার আলব্রেস্টের বিজয়ী প্রতাবর্তন উপলক্ষ্যে বাড়ির উঠনে এক বিশেষ ভোজের আয়োজন করে। গান-বাজনা-সহ এক দীর্ঘ ও স্মরণীয় ভোজের শেষে, আলব্রেস্ট টেবিলের প্রধান আসন থেকে উঠে দাড়িয়ে তার সেই ভাইয়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পানীয়ের গ্লাস উঁচুতে তুলে ধরেন কারণ বিগত বছরগুলোতে তার ভাইয়ের ত্যাগস্বীকারের কারণেই তিনি তার লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তার শেষ কথাগুলো ছিল, “আমার প্রিয় ভাই আলবার্ট, এবার তোমার পালা। এখন তুমি নূরেমবার্গে গিয়ে তোমার স্বপ্ন পূরণ করো আর আমি তোমাকে সাহায্য করব।”
সকলের দৃষ্টি টেবিলের অপর প্রান্তে বসে থাকা আলবার্টের দিকে চলে যায়। আলবার্টের শুকনো মুখের উপর দিয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি মাথা নাড়িয়ে বার বার বলতে থাকেন “না... না... না... না...।”
শেষে, আলবার্ট উঠে দাঁড়িয়ে তার গাল বেয়ে পড়া চোখের জল মুছতে শুরু করেন। টেবিলের অপর প্রান্তে থাকা তার প্রিয় ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে, তার ডান পাশের গালের কাছাকাছি হাত দুটো নিয়ে তিনি বলেন, “না, ভাই। আমি নুরেমবার্গে যেতে পারব না। আমার জন্য অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। দেখ, দেখ চার বছর খনিতে কাজ করে আমার হাতের কী অবস্থা হয়েছে! হাতের সমস্ত আঙুলের হাড় অন্তত একবার হলেও ভেঙে গিয়েছে আর সম্প্রতি আমি আর্থরাইটিসে এত কষ্ট পাচ্ছি যে, আমি এমনকী গ্লাস তুলে তোমার প্রতি সম্মান দেখাতে পারিনি, যে-কাজটা পার্চমেন্ট কাগজে কিংবা ক্যানভাসে কলম অথবা ব্রাশ দিয়ে লাইন টানার চেয়েও সহজ। না ভাই ... আমার জন্য অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।”
এরপর ৪৫০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। ইতিমধ্যে আলব্রেস্ট ডুরারের শত শত শিল্পকর্ম যেমন, পেলসিল ও সিলভার পয়েন্ট স্কেচ, জল রং, কয়লা, কাঠের খোদাই ও কপার খোদাই শিল্পকর্ম পৃথিবীর প্রতিটা বড়ো বড়ো জাদুঘরে টাঙ্গানো রয়েছে। কিন্তু, সম্ভবত আপনি প্রায় অন্য সমস্ত লোকের মতোই আলব্রেস্ট ডুরারের কেবল একটা শিল্পকর্মের সঙ্গে বেশ পরিচিত। আপনি হয়তো এই শিল্পকর্মের কপি বিভিন্ন ঘরে কিংবা অফিসে টাঙ্গিয়ে রাখতে দেখেছেন।
ত্যাগস্বীকার, আলব্রেস্ট ডুরারের অতি যত্নে আঁকা তার ভাইয়ের দুটো হাত, যেখানে একটার সঙ্গে একটা হাতের তালু লেগে রয়েছে আর শীর্ণ আঙ্গুলগুলো উপরের দিকে প্রসারিত রয়েছে। তিনি তার এই শক্তিশালী চিত্র কর্মের নাম দিয়েছিলেন, “হাত” কিন্তু সমস্ত পৃথিবীর লোক তার এই সেরা শিল্পকর্ম দেখে হৃদয় থেকে নাম পাল্টে ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে নাম দিয়েছে “এক প্রার্থনারত হাত।”
অনুবাদ - বৈচিত্র
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0